মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

দর্শনীয় স্থান

হযরত শাহ বু-আলী কালান্দারের মাজারঃ

এটি হযরত শাহ বু-আলী কলন্দার এর আস্থানা শরীফ। বোয়ালখালীর আহল্লা কড়লডেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ অন্তর্গত কড়লডেঙ্গা পাহড়ে অবস্থিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হযরত শাহ বু আলী কলন্দারের নামের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বোয়ালখালী নামটি। অন্তত ৭০০ বছর আগে এই আসনটি আবিষ্কার হয়েছে বলে বিজ্ঞমহলের ধারণা।

এখানে মাজারের আশে পাশে যে গাছগুলো রয়েছে এই গাছ গুলোর শিরমণি থেকে অর্থাৎ গাছের পাতাগুলো থেকে এই মাজারের যে দিন ওরশ অনুষ্ঠিত হয় অর্থাৎ ফাল্গুন মাসে ২ ও ৫ তারিখে সন্ধ্যা বেলায় ওরশ উপলক্ষে গরু বা মহিষ জবেহ করার সময় এ ধরনের শির শির ধোয়া (!) উঠতে থাকে। এগুলো অনেকে বলে আলৌকিক ধোয়া, আবার অনেকে বলে এক ধরনের পোকা। সে যাই হোক না কেন- আমরা সেটাকে অবশ্যই আলৌকিক ধরে নেবো। এই আলোকিক দৃশ্য দেখার জন্য ওরশ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হাজার-হাজার নারী ও পুরুষ ভক্ত জড়ো হয় মাজার এলাকায়। যা ধর্মানুরাগীদের উৎসাহ আর উদ্দীপনার এক অন্যমাত্রা যোগ করে।

 শ্রীপুর বুড়া মসজিদঃ

চট্টগ্রাম শহরের অদূরে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী। শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্দোলনের হাজার বছরের ঐতিহ্য আছে এ অঞ্চলের। উপজেলার আমুচিয়া গ্রামে অবস্থিত বিখ্যাত মসজিদের নাম শ্রীপুর বুড়া মসজিদ। এর পূর্বেই রয়েছে জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড়। বুড়া মসজিদ তীর্থের মত সমাদৃত। এখানে দেশ বিদেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সমাগম ঘটে বরকত, ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণের আশায়। এ মসজিদ কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সন তারিখ কারো জানা নাই। তবে সবাই একমত যে, এটি মোগল পিরিয়ডের শেষ দিকে এখন থেকে প্রায় ৩০০ বৎসর পূর্বে নির্মিত হয়। মোগলদের অধস্তন পুরুষ থানাদার দীক্ষিত লোকদের পাঞ্জাগানা নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এ মসজিদের নামকরণ সম্পর্কে জানা যায় ওয়াসিন চৌধুরীর বাবা একজন ইবাদত গুজার ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ইবাদত বন্দেগীতে এতই মশগুল থাকতেন যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে মোটেই খোঁজ খবর রাখতেন না। তিনি বুড়ো বয়সে ঐ মসজিদে নামাজ, যিকির আজকারে দিন রাত কাটিয়ে দিতেন। বহুদিন চলে যেত তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনায়। তিনি এতই পরহেজগার ছিলেন যে, তাকে সবাই ‘বুড়া হুজুর’ নামে ডাকত। ইবাদত করতে করতে একদিন তিনি এই মসজিদ থেকেই হারিয়ে যান। এখনও কেউ সন্ধান পাননি বলে কথিত আছে। তাই তাঁর নামানুসারে এটি ‘বুড়া মসজিদ’ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

কালাচাঁদ ঠাকুর বাড়ীঃ

কালাচাঁদ সূত্রধর এর আদি নিবাস চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলায়। তিনি ছিলেন ধর্মভীরু এবং পরম গুরুভক্তি সম্পন্ন সন্ন্যাসি। তাঁর গুরু ছিলেন বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামের শ্রী রামহরি আচার্য্য। সনাতন ধর্মে সর্বোচ্চ সাধনার পুরস্কার হিসেবে স্বপ্ন মাধ্যমে তিনি কালাচাঁদ নামে যে মুর্তিটি পান তা স্থাপন করেন স্বপ্নের নির্দেশ অনুসারে আচার্য্য পাড়ায় এবং এরই ফলশ্রুতিতে নামকরণ করা হয় কালাচাঁদ ঠাকুর বাড়ি। তাঁর বাসস্থানও স্থাপন করেন পোপাদিয়ায় আচার্য্য পাড়ায়, সেই সূত্র ধরে তিনি বাস্তবে স্থানান্তরিত হয় উক্ত গ্রামে। সেবার মনোভাব নিয়ে দীঘির পারে নিঃসঙ্গ জীবন বেচে নেন তিনি। বর্তমান কালাচাঁদ ঠাকুর বাড়ির প্রথম কাঠামোগত রূপ দেয়া আজ থেকে প্রায় তিনশত বছর আগে তাঁরই এক ভক্ত শ্রী নন্দরাম। বর্তমান মন্দিরটি বিভিন্নভাবে সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা হলেও এর পাকাকরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন শ্রী রাম জীবন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যে কোন তিথিতে এখানে আসেন তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আরজি নিয়ে। তাঁদের বিশ্বাস শিশুকে এখানে অন্নপ্রাসন করালে ঐ শিশুটি সমস্ত বিপদ থেকে মুক্ত থাকে। বিখ্যাত এই কালাচাঁদ ঠাকুর বাড়িতে দেশ বিদেশের হাজার ভক্ত আসে প্রতিনিয়ত যা পোপাদিয়া ইউনিয়ন তথা বোয়ালখালীকে সমৃদ্ধ করেছে বিশ্ব জগতময়।

স্যার আশুতোষ সরকারী কলেজঃ

চট্টলার ঐতিহ্যবাহী স্যার আশুতোষ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৯ সনে। অঁজ পাড়া গাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত তখনকার সময়ে এ কলেজ ছিল গ্রামাঞ্চলে উচ্চ শিক্ষার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ইত্যাদি অঞ্চলের ছেলেরা মূলত: এখানেই পড়ালেখা করত। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন কারণে পড়ার জন্য এ কলেজকে বেছে নিত। গ্রামীণ পরিবেশে প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত বিশাল এলাকা নিয়ে এ কলেজের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পন্ডিত প্রবর জ্ঞানী-গুণী অধ্যাপকবৃন্দ। কলেজের শিক্ষাবর্ষের ইতিহাসে অনেক বরেণ্য শিক্ষক-শিক্ষকতা করেছেন এবং অত্র এলাকায় জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়েছেন।

ব্রিটিশ আমলের শেষ দশকে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির ইতিহাস পুরো পাকিস্তানী পিরিয়ড পার হয়ে বর্তমানের বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় অনেক চড়াই উৎরাই পার হওয়ার পর কলেজের অধ্যাপকবৃন্দ এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৮৬ সনের ২৬ অক্টোবর কলেজটি সরকারীকরণ করা হয়।

এ অঞ্চলের প্রথম ইংরেজী মাধ্যম স্কুল সারোয়াতলী পিসিসেন স্কুল, প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৮৭৮-৭৯ সনে। আরবী শিক্ষায় প্রথম মাদ্রাসা বেঙ্গুরা সিনিয়র মাদ্রাসা, প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৩০ সনে। যা দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রথম আরবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত।

মেধসমুনি আশ্রমঃ

নদীবিধৌত সুশান্ত বন-বনানীতে সুবেষ্টিত চট্টগ্রাম; অতি পবিত্র স্থান। বিষ্ণুক্রান্তির অন্তর্গত চট্টলা ভূমি বিরল। বিন্ধ্যাপর্বত এর নিকটে বিখ্যাত ভূমি দুর্লভ। আর এ সু-দুর্লভ ভূমিই আমাদের চট্টগ্রাম।

চট্টল কবি বসন্ত কুমার তাঁর ‘চট্টল প্রশস্তি গীতায়’ চট্টগ্রামকে প্রশস্তি করতে গিয়ে বিষয়টিকে উল্লেখ করেছেন-বরিশাল জেলার গৈলা গ্রাম নিবাসী বৈদিক ব্রাহ্মণকুলে ১২৬৬ বাংলার ২৫ অগ্রহায়ন তারিখে চন্দ্রশেখর নামে যে শিশুটি জন্মেছিলো, কালান্তরে সে শিশুই মহাযোগী বেদানন্দ নামে আখ্যায়িত হয়ে সনাতনী সমাজের সু-প্রাচীন শক্তিতীর্থ আবিষ্কার করে সমগ্র চট্টগ্রামকে পৃথিবীর বুকে স্বর্ণাসনে বসিয়েছেন। ধন্য চট্টগ্রাম। ধন্য স্বামী বেদানন্দজী।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টলে মেধসাশ্রম আবিষ্কার এক দৈব ঘটনা। স্বামী বেদানন্দ মহাত্মই ১৯০০ খৃষ্ঠাব্দ যোগবলে জ্ঞাত হয়েই এ পূণ্যতীর্থ উদ্ধার করেন। তাঁর সংস্কৃতে রচিত ‘মেধসাশ্রম মাহাত্ম্য’ গ্রন্থে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। (যার অনুবাদ করেছেন সুপন্ডিত দেবেন্দ্র বিজয় বসু)।

স্বামী বেদানন্দ আবিস্কৃত এ পবিত্র স্থানেই কয়েক হাজার বছর পূর্বে মহাশক্তি জগম্মাতার আগমন ঘটেছিল। এ পবিত্র স্থানই মর্ত্যলোকে মঙ্গলময়ী মায়ের আবির্ভাবের আদিস্থান। এখানেই প্রথম মৃন্ময়ী প্রতিমাসে দেবীর আরাধনা হয়েছিল। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তিতে পূজা হয়েছিলো প্রথম এ বাংলায়-এ চট্টগ্রামে। এ কথা শ্রীচন্ডীতে সুষ্পষ্ট। ঋষি মেধস মাতৃদর্শন লাভের জন্য সুরথ-সমাধিকে এ পূণ্যক্ষেত্রেই পূজা করতে আদেশ দিয়েছিলেন। এটির অবস্থান আমাদের বোয়ালখালীর আহল্লা-কড়লডেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের কড়লডেঙ্গা পাহাড়ে। এই মেধসমুনির আশ্রমের অবস্থানের কারণে আমাদের বোয়ালখালী পরিচিতি অর্জন করেছে সারা বিশ্বময়।

বুদ্ধ গয়ার শিখরের সেই গাছটিঃ

মানব পুত্র গৌতম দুঃখ মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে যে বোধিতরুর মূলে বসে ছয় বৎসর কঠোর সাধনা করে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন সে বোধিতরু সকল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিকট অতি পবিত্র। আড়াই হাজার বছরেরও আগের সেই বোধিতরুটি কি এখনও বেঁচে আছে! অলৌকিক ভাবে সত্যি হল বোধিতরু কালের প্রবাহে মরে যাওয়ার আগে প্রতিবারেই একটি করে চারা আপনা আপনি গজিয়ে উঠে। এমনি করে এখনও সেই অতি পবিত্র ঐতিহাসিক সত্যের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে বর্তমান বোধিতরুটি। বুদ্ধগয়ার বোধিতরুর মাত্র ২টি শাখা পৃথিবীর দু’টি শাখা কলমের মাধ্যমে রোপন করা হয়েছিল। এর একটি সিংহলের অনুরাধাপুরে যা রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ তীর্থভূমি হিসেবে সংরক্ষিত আছে। আর দ্বিতীয় শাখাটি আমাদের বোয়ালখালীর আহল্লা-কড়লডেঙ্গা ইউনিয়নের বৈদ্যপাড়া গ্রামের বোধিদ্রুম বিহার প্রাঙ্গণে অবস্থিত। ১২৪১ মঘাব্দে ভিক্ষুকুল গৌরব শ্রীমৎ রাধাচরণ মহাস্থবির সুদুর বুদ্ধগয়া হতে নৌকা যোগে তা বৈদ্যপাড়া এনেছিলেন। কিংবদন্তি আছে বুদ্ধগয়া থেকে আসার পথে গভীর সমুদ্রে রাধাচরণ মহাস্থবিরসহ অন্যান্য যাত্রীরা জলদস্যুর কবলে পড়েছিলেন। কিন্তু জলদস্যু তাঁদের নৌকার কাছাকাছি পৌঁছার পূর্বেই হঠাৎ করে ভীষণ ঝড়-বাদল শুরু হয়ে গেলে ভয়ে জলদস্যুরা পালিয়ে যায়। উপস্থিত সবাই সে ঘটনাকে বোধি দেবতার আর্শীবাদ হিসেবে গ্রহণ করে- রাধাচরণ মহাস্থবিরের কাছে রক্ষিত বোধিতরুকে বন্দনা করেন।

অনেক বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা বৈদ্যপাড়ার বোধিদ্রুম বিহারে অবস্থিত বোধিমূলে মনষ্কামনা পূরণে বিভিন্ন মানত করে সুফল পেয়ে ধন্য হচ্ছেন। ঐতিহাসিক এ বোধিতরু প্রাঙ্গণ বৌদ্ধদের পবিত্র তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

এছাড়াও রয়েছে- পি সি সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় (দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম মাধ্যমিক স্কুল), কালুরঘাট ব্রিজ, ভান্ডাল জুরি সড়ক, আহল্লা দরবার শরীফ।